সোমবার, ১৪ মে, ২০১২

অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি



আতাউস সামাদ
গত পরশু (রোববার) বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশ ও মিছিল শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছিল বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষে। গুম হয়ে যাওয়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ির ড্রাইভার আনসার আলীকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে এবং ওই দাবিতে এর আগে যে হরতাল হয়েছে তখন ঢাকায় গাড়ি পোড়ানো ও সরকারের সচিবালয়ে ককটেল বিস্ফোরণের জন্য দায়ী করে জোটের নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব ফৌজদারি মামলা হয়েছে সেগুলো তুলে নেয়ার, ধর-পাকড় বন্ধ করার ও গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে ওই সমাবেশ ও মিছিল কর্মসূচি নিয়েছিলেন জোট নেতারা। আওয়ামী লীগ সরকার সম্ভবত অনুমান করতে পেরেছিল যে, চট্টগ্রামে বিরোধী জোটের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অনেক মানুষ যোগ দেবেন। আর তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি ভণ্ডুল করার জন্য সরকার যুত্সই পুলিশি বন্দোবস্ত নিয়ে রেখেছিল। অতঃপর দেখা গেল পুলিশ বাদানুবাদের অজুহাতে একটি মিছিলকে বাধা দিল। পুলিশের বাধা ভাঙার জন্য অন্য প্রতিবাদকারীরা এগিয়ে এলেন। পুলিশ তখন চণ্ড মূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করল। শুরু হলো লাঠিপেটা ও টিয়ার গ্যাস। এবার বিক্ষোভকারীরাও রুদ্র রূপ ধারণ করলেন। পুলিশের লাঠি, টিয়ার গ্যাস শেল, রাবার বুলেট ও ফাঁকা গুলি বনাম বিক্ষোভকারীদের ইট-পাটকেল। আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে এ লড়াই। চট্টগ্রাম শহরের প্রায় অর্ধেক অংশ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আর তা হয় কারণ, পুলিশ-রাজনৈতিক কর্মী সংঘর্ষের একপর্যায়ে সাধারণ জনগণও বিক্ষোভে যোগ দেন।
গত পরশু সন্ধ্যায় ও রাতে টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে সারাদেশের মানুষ চট্টগ্রামের বিক্ষোভ আর পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ছবি দেখেছেন। তারা দেখেছেন পুলিশ তাদের নানারকম বন্দুকের ট্রিগার টিপেই চলেছে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা শিলাবৃষ্টির মতো পুলিশকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ছেন। একসময় কিছু বিক্ষোভকারী এমনভাবেই একটি সাদা রঙের মোটরগাড়ি উল্টে দিলেন যে মনে হচ্ছিল একটা ঝড় বুঝি গাড়িটাকে উড়িয়ে নিতে যাচ্ছিল। মুহূর্ত পরেই গাড়িটিতে আগুন ধরে যায়। এসব উত্তেজনাপূর্ণ, সংঘাতময় ও বিপজ্জনক ঘটনার কথা পুনরুল্লেখ করলাম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে। মনে হচ্ছে, সারাদেশের মানুষ সরকারকে যে বিপজ্জনক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে মানা করে আসছিলেন এখন আমরা সেই বিপদের মধ্যেই পড়ে গেছি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ।
সরকার ও বিরোধী দলকে সব শান্তিপ্রিয় ও চিন্তাশীল লোক অনুরোধ করেছিলেন সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক বিরোধের মীমাংসা করতে। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক দল যদি মাসের পর মাস রাজপথের সংগ্রাম করে যায় তাহলে একপর্যায়ে যে তাদের প্রতিপক্ষ সরকার তাতে দুর্বল হয়ে আন্দোলনকারীদের দাবি মানতে বাধ্য হয় সে কথা এদেশকে ও বিএনপি-কে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই শিখিয়েছে। এবার বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো সেই শিক্ষাকেই কাজে লাগাচ্ছে। কিন্তু এখানেও কথা আছে, বিরোধী দলগুলো নিজে থেকে আন্দোলন ও সংঘর্ষের পথ বেছে নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের মহাজোট সরকার তাদের বাধ্য করেছে রাজপথে নামতে। হঠাত্ করেই এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলতে গেলে একক সিদ্ধান্তে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের সময় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার ব্যবস্থা তুলে দিয়ে এবং বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো ও অন্য বিরুদ্ধমতাবলম্বীদের ওপর নিরবচ্ছিন্নভাবে শারীরিক হামলা, ফৌজদারি মামলা (যার বেশিরভাগই মিথ্যা), গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে এই সরকার, তাদের বেসরকারি পেটোয়া বাহিনী ও তাদের নির্দেশে পুলিশের বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত (লিখিত বা অলিখিত) আইন লঙ্ঘনকারী সদস্যদের নারকীয় জুলুমবিরোধী দলগুলোকে বাধ্য করেছে রাজপথে নেমে প্রতিবাদমুখর হতে। একইসঙ্গে সরকার পরিচালনাকারীদের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি, দেশজুড়ে সরকারি জোটের লোকজন লুটপাটের মহোত্সবে নেমে পড়া এবং তাদের শঠতা, প্রতারণা ও দস্যুতার জন্য একদিকে নিত্যপণ্যের মূল্য লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়া আর অন্যদিকে প্রাণ ও মানসম্মান দুই-ই যে কোনো সময় চলে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় যন্ত্রণাকাতর হয়ে জনগণও এখন সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলনকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। গত পরশু চট্টগ্রামের ঘটনাবলী সেই রকম বার্তাই বয়ে আনছে।
অন্যদিকে সরকার শান্তিপূর্ণ সংলাপ এবং সেরকম আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য কাজ না করে পুলিশ, র্যাব, গুলি, লাঠি, গুম ও গ্রেফতারের মাধ্যমে ‘গণতন্ত্র বিজয়’ করার জন্য ‘বদ্ধপরিকর’ হয়ে রয়েছে। কাজেই আপাতত বিরোধী রাজনীতিবিদ, তাদের সমর্থক ও সাধারণ মানুষ বর্তমান নিপীড়ক ও দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাসীনদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। এরা যে স্বৈরতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারিতা করছেন তা ফ্যাসিস্ট কায়দায়। তবে ফ্যাসিজম ও ডিক্টেটরশিপ এক ধরনের জনযুদ্ধের প্রেক্ষিত রচনা করে। কেউ যেন আমার এ সতর্কবাণীকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার উস্কানি’ বলে ধরে নেবেন না। নানা দেশে চলমান বা নিকটঅতীতের অশান্তির ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই আমার কথার প্রমাণ পেয়ে যাবেন।
দু’দিন আগে মতামত জরিপকারী মার্কিনি প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের প্রতি তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্রের জনগণের কতখানি সমর্থন রয়েছে তার একটি জরিপ-ফলাফল প্রকাশ করেছে। গ্যালাপ প্রতিষ্ঠানটি বেশ পুরনো এবং মার্কিনি মিডিয়ার কল্যাণে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই গ্যালাপের এশিয়া বিষয়ক জরিপ বলছে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ পরিচালনার প্রতি তার দেশের ৭৭ শতাংশ মানুষের আস্থা রয়েছে। অনাস্থা রয়েছে মাত্র ১৯ শতাংশের। এই গ্যালাপ-জরিপ দেখে শেখ হাসিনা মনে করতে পারেন যে, তিনি, তার সরকার ও তার দল গত তিন বছর ধরে যা যা করেছেন তার সবই খুব ভালো। তারা বলতে পারেন যে, তাদের কোনো ব্যর্থতা নেই। তারা এই সিদ্ধান্তও নিতে পারেন যে, যারা তাদের সমালোচনা করে বা বিরোধিতা করে তারা সবাই ষড়যন্ত্রকারী, মিথ্যাবাদী এবং সেজন্য পিটিয়ে তাদের হাড়গোড় ভেঙে মেরে নির্জন রাস্তার পাশে বা খানাখন্দে ফেলে রাখাই হচ্ছে উপযুক্ত শাস্তি। আর তাদের কাউকে জেলে পাঠানো হবে নেহাতই দয়া প্রদর্শন। অর্থাত্ এখন বিরোধীদের ওপর সরকারি নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়াটাই হবে ‘যুক্তিসঙ্গত’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের কাছে আমাদের বিনীত নিবেদন যে, গ্যালাপের একেবারে বিপরীত ফলাফল দেখা যাচ্ছে এমন মতামত জরিপও আছে। সেগুলোও মনে রাখবেন। যেমন ঢাকার ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টার এই বছরের (২০১২) ৬ জানুয়ারি বর্তমান সরকারের তিন বছরপূর্তি উপলক্ষে একটা মতামত জরিপ প্রকাশ করেছিল। তাতে একটা প্রশ্ন ছিল, আপনি কি মনে করেন দেশ সঠিক পথে চলছে, না ভুল পথে যাচ্ছে? এর উত্তরে ৪৪ শতাংশ অভিমতদাতা বলেছিলেন, দেশ ভুল পথে চলেছে। আর দেশ সঠিক পথে চলেছে বলেছিলেন ৪১ শতাংশ। দেশে ‘কোনো পরিবর্তন নেই’ বলেছিলেন ১৪ শতাংশ মতদাতা। অর্থাত্ বেশিরভাগ উত্তরদাতা জানিয়েছিলেন, তারা বর্তমান সরকারের দেশ পরিচালনার ফলাফল দেখে অসন্তুষ্ট। ডেইলি স্টার পত্রিকার ওই জরিপে আরেকটা প্রশ্ন ছিল, আগামীকাল যদি দেশে নির্বাচন হয় তাহলে আপনি কোন দলকে ভোট দেবেন? এর উত্তরে ৪০ শতাংশ জানিয়েছিলেন তারা আওয়ামী লীগকে (শেখ হাসিনার দল) ভোট দেবেন, ৩৭ শতাংশ বলেছিলেন বিএনপিকে এবং ৬ শতাংশ দেবেন জাতীয় পার্টিকে। এই দুই প্রশ্নের উত্তরে দেখা যাচ্ছে কোনোক্রমেই ৭৭ শতাংশ অভিমতদানকারী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে নয়।
ওই একই সময়ে ঢাকার প্রথম আলো পত্রিকাও আলাদা একটি মতামত জরিপ প্রকাশ করে। তাতে দেখা গিয়েছিল শতকরা ৫২ জন মতদানকারী মহাজোট সরকারের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট। আর দলীয় ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন ৩৮ শতাংশ এবং বিরোধী দল বিএনপির পক্ষে ছিলেন শতকরা ৪৩ জন। ঘরের যোগীদের পায়ে না ঠেললেও পারবেন বর্তমান সরকার। বরং তাদের সংগৃহীত মতামতকে গুরুত্ব দিলেই ভালো হবে, কারণ, গ্যালাপ প্রতিষ্ঠানের নিজ দেশের সরকার এখন আওয়ামী লীগের কাজকর্মে মেলা ঘাটতি দেখতে পাচ্ছে। আবার দেশেও বর্তমান সরকারের আন্তরিক সমর্থক পত্রিকা সমকাল গত জানুয়ারিতে সরকারের তিন বছর নিয়ে যে মতামত জরিপ প্রকাশ করেছিল তাতেও সরকারের কাজকর্মে অসন্তুষ্টদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখা গিয়েছিল। এখানে মনে রাখা ভালো হবে যে, গ্যালাপের জরিপ চলে গত বছর এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও সমকাল তাদের জরিপগুলো করে গত ডিসেম্বরের দিকে। তাছাড়া, আট মাস ধরে গ্যালাপ মতামত সংগ্রহ করে মাত্র ১০০০ জনের। প্রথম আলো, স্টার ও সমকাল মতামত নেয় অনেক বেশি মানুষের। আর আট মাস ধরে কোনো সরকার বা কোনো সরকারের প্রধানন্ত্রীর প্রতি তার দেশের জনগণের সমর্থন একই রকম থাকবে, এই তত্ত্বটির ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে গ্যালাপের কাছে। একটি বিষয়ে এতদিন ধরে এত কম সংখ্যক মানুষের মত নিয়ে কোনো জরিপ আমি এই প্রথম দেখলাম। তবে আমরা বোকারা আর কতটুকুই-বা জানি!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন